গত জুলাইয়ের শেষভাগ থেকে গ্যাস সরবরাহ সংকটে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্প এলাকাগুলোতে শতাধিক পোশাক ও বস্ত্র কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়া ও নরসিংদীর মতো শিল্পঘন এলাকায় কারখানাগুলো এখন স্বাভাবিক সক্ষমতার অর্ধেক বা তারও কম উৎপাদনে চলছে। সংকটটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘদিনের দ্বিতীয় অবস্থান ভিয়েতনামের কাছে হারিয়েছে, আর আগামী ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত ও বৃহত্তম কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে পোশাক শিল্পে এই তিনটি চাপ একসঙ্গে আসায় খাতসংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

গ্যাস সংকটে থমকে উৎপাদন

২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে পড়ায় দৈনিক সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে সচল হলেও সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি; ১৫ আগস্ট নাগাদ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানো এই সংকটে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২.০৩ বিলিয়ন ঘনফুটে, যেখানে চাহিদা ছিল ৩.৮৫ বিলিয়ন ঘনফুট।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হবিগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্প এলাকা। হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে প্রায় ২ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গাজীপুরে প্রায় ৩,৫০০ কারখানার মধ্যে ৫২৫টির মতো কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে বা ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে, আর চালু কারখানাগুলোতেও উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৪৫০টি ডাইং কারখানা বন্ধ হওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানা কাঁচামাল-সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে আছে, আর নরসিংদীর মাধবদীতে বন্ধ হয়ে গেছে সেখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ বস্ত্র ও ডাইং কারখানা। মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানা ১০ আগস্ট থেকে পুরোপুরি বন্ধ।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, "কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম গ্যাসও আমরা পাচ্ছি না।" পোশাক শিল্প বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, "এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নয়, ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা।" নরসিংদী-মাধবদী এলাকায় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় শিল্প-মালিকরা।

নতুন নয় কারখানা বন্ধের প্রবণতা

এই সংকট নতুন কোনো ধারার শুরু নয়, বরং চলতি প্রবণতার সবশেষ ধাক্কা। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাতটি প্রধান শিল্প অঞ্চলে মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে - এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি, বিকেএমইএর ৩৫টি, বিটিএমএর ৮টি, বেপজার রপ্তানিমুখী কারখানা ১৯টি এবং বাকি ২৮৭টি অ-পোশাক খাতের। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব বন্ধ হওয়া কারখানায় সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক; চলতি বছরের প্রথমার্ধেই আরও ৮০টি কারখানায় ছাঁটাই হয়েছেন ১৯ হাজার ১৮৮ জন। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "মেশিন বন্ধ থাকলেও বেতন, ব্যাংক সুদের মতো স্থায়ী খরচ ঠিকই চলতে থাকে" - যা ব্যাখ্যা করে কেন স্বল্পমেয়াদি উৎপাদন-বিঘ্নও কারখানা মালিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিতে পারে।

বিশ্ববাজারে হারানো দ্বিতীয় অবস্থান

এই ভেতরের চাপের পাশাপাশি বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ হিসাবে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়ায় ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারে, আর ভিয়েতনামের ৩৯.৬৪ বিলিয়ন ডলারে - মাত্র ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের ব্যবধানে বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে ধরে রাখা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকের অবস্থান হারায়। বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে ভিয়েতনামের অবকাঠামোগত সুবিধাকে দায়ী করেছেন বলে জানা গেছে - ভিয়েতনামের কারখানাগুলো চীন থেকে কাঁচামাল আনতে পারে প্রায় এক সপ্তাহে, যেখানে বাংলাদেশে এতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়েছে ২০২০ সালে, আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ শর্ত পূরণকারী পোশাকের ওপর শুল্ক পুরোপুরি শূন্যে নেমেছে।

তবে এই র‍্যাংকিং নিয়ে দ্বিমতও আছে। মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, "ভিয়েতনামের রপ্তানি আমাদের চেয়ে সবসময়ই বেশি দেখাবে, কারণ তাদের হিসাবে পোশাকের পাশাপাশি সব ধরনের বস্ত্রপণ্য যুক্ত থাকে," যোগ করেন, "হোম টেক্সটাইল ও বস্ত্র খাতের আয় পোশাকের সঙ্গে যোগ করলে আমরা আবারও ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাব।"

এলডিসি-উত্তরণ আরও কাছে, বাড়ছে শুল্ক-শঙ্কা

এই প্রতিযোগিতামূলক চাপ আরও বাড়তে চলেছে আগামী ২৪ নভেম্বর, যেদিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ঘটাবে। উত্তরণের পরও তিন বছরের একটি রূপান্তর সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'এভরিথিং বাট আর্মস' (ইবিএ) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা বহাল থাকবে, কিন্তু ২০২৯ সালের শেষে সেই সুবিধাও শেষ হয়ে যাবে। এরপর বাংলাদেশ জিএসপি-প্লাস সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবে, তবে সেই কাঠামোয় তৈরি পোশাকের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নেই - ফলে গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হতে পারে, যা এমনিতেই ভিয়েতনামের কাছে বাজার হারাতে থাকা এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও চাপে ফেলবে। জিএসপি-প্লাস পেতে হলে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, সুশাসন ও পরিবেশ সংক্রান্ত ৩২টি আন্তর্জাতিক সনদ অনুসমর্থন ও বাস্তবায়ন করতে হবে বাংলাদেশকে।

গত জুন মাসে উত্তরায় বিজিএমইএর জরুরি পরিচালনা পর্ষদ সভায় সংগঠনটি সরকারের কাছে একটি 'নীতি সহায়তা সনদ' জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণসহ বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে নীতি সহায়তার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকবে। এর অংশ হিসেবে বিজিএমইএ উৎসে কর কমানো, নগদ প্রণোদনার ওপর আয়কর হ্রাস এবং কৃত্রিম তন্তুর (ম্যান-মেইড ফাইবার) কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের দাবি জানিয়েছে।

স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এবং ইতিমধ্যে বিলম্বিত ক্রয়াদেশগুলো কতটা ধরে রাখা যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রশ্নটি হলো - ২০২৯ সালে ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক-সুবিধা শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশ পেছনের সংযোগ শিল্প, বন্দর-অবকাঠামো ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে ভিয়েতনামের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে কি না। বিজিএমইএর নীতি সহায়তা সনদ সরকারের কাছ থেকে কতটা সাড়া পায়, তার ওপরই এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে এই উত্তর।