নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এবারই চতুর্থবারের মতো এই জোটের সভাপতিত্ব করছে ভারত, আর সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে "স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসইতার জন্য নির্মাণ"। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ ব্রিকসভুক্ত ১১টি দেশের নেতারা যোগ দিচ্ছেন দুই দিনের এই আয়োজনে।
যুক্তরাষ্ট্র ব্রিকসের সদস্য নয়। তারপরও সম্মেলনের আলোচনায় সবচেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক - এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান যুদ্ধ আর হোয়াইট হাউসের শুল্ক-হুমকি এমনিতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে, যার প্রভাব পড়েছে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের ধারণা, সম্মেলন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমালোচনা করে কোনো যৌথ বিবৃতি আসার সম্ভাবনা কম। তাঁর ভাষায়, "ভারতের এমন কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়ার সক্ষমতা নেই, যা ওয়াশিংটনের বিপক্ষে যায়", কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তির শেষ পর্যায়ে রয়েছে দিল্লি। তাঁর মতে, বিস্তৃত হতে থাকা এই জোটের সদস্যদের স্বার্থে এত বেশি পার্থক্য তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী যেকোনো ভাষা থাকবে কেবল "অস্পষ্ট ও পরোক্ষ"।
এই বিভাজনের একটি বড় উদাহরণ সংযুক্ত আরব আমিরাত। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশটি সম্প্রতি ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছিল, যা তেহরান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে। ফলে তেহরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করে - এমন কোনো ভাষার প্রতি আমিরাতের সমর্থন করার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। কুগেলম্যান বলেন, "আপনি এমন বেশ কয়েকটি সদস্যকে যুক্ত করেছেন, যাদের মধ্যে বনিবনা নেই" - আর এখানেই ব্রিকসের সম্প্রসারণের একটি বড় বিড়ম্বনা: সদস্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটের গুরুত্ব বাড়লেও ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়ে উঠছে আরও কঠিন।
ট্রাম্প নিজেও ব্রিকসের ডলার-নির্ভরতা কমানোর (ডি-ডলারাইজেশন) প্রচেষ্টার কড়া সমালোচক। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, মার্কিন ডলারের বিকল্প কোনো মুদ্রাকে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো সমর্থন করলে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে - একটি হুমকি যা তিনি একাধিকবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সংখ্যায় ব্রিকসের ওজন
এক দশকের ব্যবধানে ব্রিকসের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। বিবিসি মনিটরিংয়ের বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমান ১১ সদস্যের ব্রিকস এখন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ, বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
জোটের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি), যেটি ইতিমধ্যে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করেছে, যার একটি বড় অংশ গেছে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে। এর পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার কোটি ডলারের একটি জরুরি রিজার্ভ ব্যবস্থা (কনটিনজেন্ট রিজার্ভ অ্যারেঞ্জমেন্ট), যদিও এখন পর্যন্ত বাস্তবে তা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।
নিরাপত্তার দিক থেকেও এবারের আয়োজন ছিল ব্যতিক্রমী। একাধিক রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি সামনে রেখে নয়াদিল্লিকে কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়েছে, শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে হাজারো নিরাপত্তাকর্মী।
ভারতের সামনে বড় সুযোগ, বড় চ্যালেঞ্জও
বিশ্লেষকদের মতে, আয়োজক হিসেবে এই সম্মেলন ভারতের জন্য গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দাবি করার একটি বড় সুযোগ। বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা সংস্কার, আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের যে দাবি ভারত দীর্ঘদিন ধরে তুলছে, তার সঙ্গে ব্রিকসের লক্ষ্যের বেশ মিল রয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয় - জোটের ভেতরে চীনের বড় প্রভাব সামলে, উন্নয়নশীল বিশ্বে নিজের কূটনৈতিক অবস্থান আরও গভীর করার পথ খুঁজে বের করতে হবে দিল্লিকে।
বাংলাদেশ কেন যোগ দিচ্ছে না
এই সম্মেলনের একটি অংশে বাংলাদেশকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত - তবে সরাসরি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী রহমানকে ব্রিকসের একটি আউটরিচ অধিবেশনে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকা কোনো সরকারি প্রতিনিধি পাঠায়নি।
সম্মেলনের কয়েক দিন আগেও পরিস্থিতি ছিল অস্পষ্ট। ৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে তখনো কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই তাঁদের কাছে। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জানিয়ে দেয়, সম্মেলনে তারা কোনো সরকারি প্রতিনিধি পাঠাবে না।
অথচ বাংলাদেশ নিজেই বেশ কিছুদিন ধরে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে, আর সেই আবেদনে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার খবরও রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি ঘিরে দুই দেশের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছে, দিল্লির আমন্ত্রণে সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে সেটিও একটি প্রেক্ষাপট হতে পারে। সদস্যপদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ পর্যায়ে এই অনুপস্থিতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ব্রিকসে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
