জাতীয় সংসদে গত ৬ সেপ্টেম্বর নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে - জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬, জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬, এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬। বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি বিল একসঙ্গে নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার - এই তিনটি ক্ষেত্রকে নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় আনার একটি বড় পদক্ষেপ।

গুমের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান

জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল অনুযায়ী, গুমকে একটি আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, তবে নিখোঁজ ব্যক্তি মারা গেলে বা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও বিলে রাখা হয়েছে, এবং তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।

নতুন মানবাধিকার কমিশন, তবে প্রশ্ন থেকেই গেল পুলিশ-তদন্ত নিয়ে

২০০৯ সালের পুরনো আইন বাতিল করে নতুন মানবাধিকার কমিশন বিলে একজন চেয়ারপারসন ও চারজন সদস্যের একটি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক। ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা দিতে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ জারির ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

তবে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, আইনে একধরনের "দ্বৈত নীতি" রয়ে গেছে - পুলিশ বা র‍্যাবের মতো শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশনকে সরাসরি তদন্তে নামার আগে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে জানাতে হবে। খসড়া আইন নিয়ে আলোচনার সময়েও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অধিকারকর্মী সংগঠনগুলো একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল - তাদের মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের যে ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, নতুন বিলে তা থেকে পিছু হটার শঙ্কা রয়েছে।

সম্পত্তি হস্তান্তরে দাতার অধিকার

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলে ১৮৮২ সালের পুরনো আইন সংশোধন করে "আজীবন রক্ষিত দান" ধারণা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে কেউ সম্পত্তি হস্তান্তর বা দান করার পরও নিজের জীবদ্দশায় সেটি ভোগ-দখলের অধিকার ধরে রাখতে পারেন। এই বিধান সব ধর্মের নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির সুরক্ষাও জোরদার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বিরোধিতা ও ওয়াকআউট

তিনটি বিল পাসের সময় জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি ছিল সবচেয়ে বেশি - তাদের অভিযোগ, সংশোধনীর কিছু বিধান ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সাধারণ নাগরিক ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বৈষম্যমূলক আচরণের সুযোগ তৈরি করে।

তিনটি বিলই সরকারি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়েছে। নতুন মানবাধিকার কমিশন কার্যকরভাবে গঠিত হওয়ার পর শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে বাস্তবে কতটা স্বাধীনতা পাবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।