বিশ্বের বৃহত্তম মুক্তবাণিজ্য জোট আরসিইপিতে (রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ) যোগদানের পথে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জোটের পঞ্চম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশসহ চার আবেদনকারী অর্থনীতির সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য একটি বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর বাজার সুবিধা হারানোর যে দুশ্চিন্তা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে রয়েছে, এই জোটের সদস্যপদকে তার একটি জবাব হিসেবে দেখছে সরকার। তবে সদস্যপদ এখনো নিশ্চিত নয়, আর তা পেলে রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগে যতটা লাভের সম্ভাবনা, শুল্ক আয়ে ততটাই ক্ষতির আশঙ্কা—এক গবেষণার হিসাবে পূর্ণ শুল্ক উদারীকরণে বছরে ৪.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৪ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিদ্ধান্তটি জানায়। মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, আরসিইপির জয়েন্ট কমিটির সুপারিশ অনুমোদন করে মন্ত্রীরা বাংলাদেশ, চিলি, শ্রীলঙ্কা ও হংকংয়ের (চীন) জন্য একটি অ্যাড হক অ্যাকসেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হন। এই গ্রুপ আবেদনকারী দেশগুলো জোটের নিয়মকানুন মানতে ও নিজেদের বাজার সদস্য দেশগুলোর জন্য খুলে দিতে কতটা প্রস্তুত, তা যাচাই করবে। বৈঠকে গত ফেব্রুয়ারিতে জানানো উরুগুয়ের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করা হয়, যা পরে বিবেচনা করা হবে। বৈঠকে সহসভাপতিত্ব করেন ইন্দোনেশিয়ার ভাইস বাণিজ্যমন্ত্রী দিয়াহ রোরো এস্তি উইদিয়া পুত্রি ও নিউজিল্যান্ডের সংসদ সদস্য ড. শেন রেটি।

আসিয়ানভুক্ত ১০ দেশের সঙ্গে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড—এই ১৫ দেশের জোট বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ ও বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ২০২০ সালের নভেম্বরে সই হওয়া চুক্তিটি ২০২২ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হয় এবং ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন সদস্যের জন্য খোলা হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন, কারণ বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য জোটে যোগদানের পথে দেশ দৃশ্যমান অগ্রগতি করেছে। "আমরা নীতিগত সম্মতি পেয়েছি। এখন একটি যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি এ নিয়ে কাজ করবে," বলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এই অনুমোদনে সদস্যপদ নিশ্চিত না হলেও বড় ভোক্তাবাজারের কারণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেশি।

কেন এখন: এলডিসি উত্তরণের হিসাব

আরসিইপিতে যোগদানের উদ্যোগের পেছনে মূল তাগিদ এলডিসি উত্তরণ। জাতিসংঘের সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা, যার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান ও কানাডার মতো বাজারে এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা ধাপে ধাপে উঠে যাবে। বর্তমান সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির (সিডিপি) কাছে প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করে; সিডিপি তাতে ইতিবাচক সুপারিশ দিয়েছে এবং জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠিয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত হয়নি—অর্থাৎ উত্তরণ ২০২৬ সালেই হবে, নাকি ২০২৯ সালে, তা এখনো অনিশ্চিত।

উত্তরণ যখনই হোক, শুল্কমুক্ত সুবিধা টিকিয়ে রাখার বিকল্প পথ খুঁজছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আরসিইপির সদস্যপদ উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা ধরে রাখা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযোগ জোরদার এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে সহায়ক হবে। জোটটির গুরুত্ব বাংলাদেশের আমদানির দিক থেকেই বেশি: গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের এক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে এই জোটের দেশগুলো থেকে, অথচ রপ্তানির অংশ সামান্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে জোটের দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ছিল ৩.৯ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানি ২৪.৫ বিলিয়ন ডলার। সেবা খাতেও চিত্র একই: সিপিডির হিসাবে ২০২৩ সালে জোটের দেশগুলোতে বাংলাদেশের সেবা রপ্তানি ছিল ১.৫ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ৩.৬১ বিলিয়ন ডলার।

কতটা লাভ, কতটা ক্ষতি

সদস্যপদের লাভ-ক্ষতি নিয়ে দেশীয় গবেষণাগুলোর হিসাব একমুখী নয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষার হিসাবে, জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩.২৬ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে ৩.৩৬ শতাংশ। র‌্যাপিডের চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত সমীক্ষা অনেক রক্ষণশীল: তাদের হিসাবে রপ্তানি বাড়বে ৪১৫ মিলিয়ন ডলার, আর জোটের বাইরের বাজার থেকে সরে আসবে আরও ৮০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি—মোট রপ্তানির ১ শতাংশেরও কম; তবে কোনো কোনো পণ্যের রপ্তানি ১০০ শতাংশের বেশি বাড়ার সম্ভাবনাও দেখা গেছে।

ক্ষতির দিকটি স্পষ্টতর। র‌্যাপিডের সমীক্ষা অনুযায়ী, জোটের নিয়মে পূর্ণ শুল্ক উদারীকরণ করলে বাংলাদেশের শুল্ক আয় বছরে ৪.২ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে—যা জিডিপির প্রায় ১.৭ শতাংশ এবং বর্তমান শুল্ক আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৪ সেপ্টেম্বরের আন্তঃব্যাংক ভারিত গড় দর (ডলারপ্রতি ১২৩.২২ টাকা) ধরলে অঙ্কটি দাঁড়ায় প্রায় ৫১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যেহেতু আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস চীনসহ প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো এই জোটেরই সদস্য, শুল্ক কমলে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব হারাতে হবে সেসব দেশ থেকে আমদানিতে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, ধাতু ও মোটরযানের মতো খাতে দেশীয় উৎপাদকেরা আমদানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চাপে পড়তে পারেন বলে সমীক্ষায় সতর্ক করা হয়েছে। বিপরীতে ভোক্তা ও আমদানিনির্ভর শিল্পের জন্য সস্তা আমদানি লাভজনক—সমীক্ষাটি সামগ্রিক কল্যাণ-লাভ ধরেছে ৯৫০ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ হিসাবটি মিশ্র: রপ্তানিকারক, বিশেষত এলডিসি সুবিধা হারানোর মুখে থাকা তৈরি পোশাক খাত এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনা ইতিবাচক; সরকারের রাজস্ব এবং আমদানি-প্রতিদ্বন্দ্বী দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকি নেতিবাচক। কোন দিক ভারী হবে, তা নির্ভর করবে আলোচনায় বাংলাদেশ কোন খাতে কত দ্রুত শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয় তার ওপর।

সব সদস্যের সম্মতি লাগবে

র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুর রাজ্জাক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, এক পর্যায়ে ইঙ্গিত ছিল যে আরসিইপি হয়তো মাত্র দুটি দেশকে নতুন সদস্য হিসেবে নেবে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, সদস্যপদ পেতে জোটের সব সদস্য দেশের সম্মতি লাগবে; একটি দেশ আপত্তি জানালেও বাংলাদেশের যোগদান সম্ভব হবে না। "সে কারণে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাতে হবে," বলেন তিনি।

আলোচনার শর্ত নিয়েও সতর্কবার্তা আছে। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান গত অক্টোবরে বলেছিলেন, "আরসিইপিতে বাংলাদেশকে সেবা বাণিজ্য উদারীকরণে ডব্লিউটিও-প্লাস প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।" তাঁর ব্যাখ্যায়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে টেলিযোগাযোগ ও পাঁচতারা হোটেল খাত খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ব্যাংক খাতও অনেকটা উদার, ফলে এসব খাত জোটকে দেওয়া সহজ; কিন্তু সদস্য দেশগুলোর বাজারে ঢুকতে হলে আরও খাত খুলতে হবে, যা ডব্লিউটিওর প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি।

ওয়ার্কিং গ্রুপ কবে কাজ শুরু করবে বা আলোচনা শেষ হতে কত সময় লাগবে, যৌথ বিবৃতিতে তার কোনো সময়সীমা নেই। কোন খাতে কতটা শুল্ক ছাড় দিতে হবে, হারানো রাজস্ব কীভাবে পোষানো হবে এবং দেশীয় শিল্পকে আমদানির ঢল থেকে বাঁচাতে কী রক্ষাকবচ চাওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনায় ঠিক হবে। তার আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদনের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে, এই আলোচনায় বাংলাদেশের হাতে কতটা সময় আছে।